ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতায় অনিশ্চিত আবহ তৈরি করেছে। এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় অংকের শুল্ক আরোপ করে পরে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন সম্প্রতি। শুল্ক রদের পেছনে ভূমিকা রেখেছে মার্কিন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। বিষয়টি নিয়ে গোপনে দেনদরবার চালিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। কারণ ট্রাম্প প্রকাশ্য বিরোধিতা পছন্দ করেন না। অবশ্য প্রকাশ্য সতর্কবার্তা যে সবসময় আমলে নেননি এমন নয়, তবে এর পরিমাণ কম। এফটিতে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
২ এপ্রিলকে ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণা দিয়ে বেশির ভাগ দেশের ওপর বড় অংকের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চাপিয়ে দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি কার্যত বিশ্বের বৃহত্তম রফতানিকারক চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণায় পুঁজিবাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মার্কিন ট্রেজারি, ডলার ও বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে ধস নামায় রাতারাতি ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য উধাও হয়ে যায় এবং আর্থিক মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়। বন্ড মার্কেটের দ্রুত পরিবর্তন সবাইকে বিচলিত করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে লিজ ট্রাসের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে কিনা, সে প্রশ্ন তুলতে থাকেন। আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে মাত্র দেড় মাসের মধ্যে ক্ষমতা হারান এ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
এমন পরিস্থিতিতে তোলপাড় শুরু হয় সিলিকন ভ্যালি থেকে শেলের জ্বালানি তেলক্ষেত্র পর্যন্ত। জেপি মরগানের প্রধান জেমি ডিমন থেকে অ্যাপলের টিম কুক পর্যন্ত বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতারা ট্রাম্পকে বিপদের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে দ্রুত প্রচারণা শুরু করেন, যার বেশির ভাগই ছিল পর্দার আড়ালে। এতে ট্রাম্প কিছু রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ থেকে পিছু হটেন, কানাডা ও মেক্সিকোর অধিকাংশ পণ্য শুল্ক অব্যাহতি পায়, গাড়ি নির্মাতারা বড় ছাড় এবং কৃষকদের জন্য আর্থিক প্যাকেজের ইঙ্গিত আসে। ফলে পুঁজিবাজার আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ লবিস্ট ব্রায়ান ব্যালার্ড বলেন, ‘কোম্পানিগুলো যখন সঠিক মানুষকে প্রভাবিত করতে ছুটে বেড়াচ্ছিল, তখন ওয়াশিংটনে এক প্রকার ঝড় বয়ে গিয়েছিল।’
এ সময় ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগান অনেক নির্বাহী। নির্বাচনের পর মার-আ-লাগো সফর কিংবা ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার সূত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাদের অনেকের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওয়াশিংটনভিত্তিক এক করপোরেট উপদেষ্টা জানান, ইলেকট্রনিক পণ্যে শুল্ক ছাড়ের মতো অনেক সিদ্ধান্ত টিম কুকের মতো নির্বাহীদের সঙ্গে সরসারি আলাপের সূত্রে এসেছে।
রিপাবলিকান ধনকুবের ও গৃহস্থালি মেরামত সরঞ্জাম চেইন হোম ডিপোর সহপ্রতিষ্ঠাতা কেন ল্যাঙ্গোনের কাছে স্পষ্ট বার্তা ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পরিচিত ডিআইওয়াই স্টোরকে ধ্বংস করে দেবে শুল্ক। কিন্তু করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি মেনে নেবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দেনদরবার থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রকাশ্য চাপের তুলনায় বেশি কার্যকর গোপন বোঝাপড়া। এছাড়া মেইন স্ট্রিট বা সাধারণ জনগণ ও ছোট ব্যবসায়ীরা কী ভাবছেন, তার ওপর খুব গুরুত্ব দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অটো জায়ান্ট বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ ও ভক্সওয়াগনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুল্ক ছাড়ের জন্য জার্মান কূটনীতিক বা ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। গত ১৮ এপ্রিল তারা হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদিকে ফোর্ড, স্টেলান্টিস ও জিএম নিজস্ব লবিং জোরদার করে। সর্বশেষ খবর হলো গাড়ি শিল্পের জন্য কিছু ছাড় দিয়েছেন ট্রাম্প। অটো নির্মাতাদের আংশিক এ বিজয়কে মিশিগানে নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানি থেকে অনুদান সমন্বয় করেন শেল খাতের বিলিয়নেয়ার হ্যারল্ড হ্যাম। তিনি বোঝান যে শুল্ক জ্বালানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কিছু মার্কিন পরিশোধনাগার পুরোপুরি কানাডার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। পরে কানাডা থেকে আমদানির ওপর কর কমিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বড় খুচরা বিক্রেতারাও গোপনে প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করেন যে শুল্ক পণ্যের দাম বাড়াবে। ওয়ালমার্টের সিইও ডগ ম্যাকমিলন, টার্গেটের ব্রায়ান করনেল এবং হোম ডিপোর সিইও টেড ডেকার হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে এ বার্তা দেন। একইভাবে অ্যাপলের টিম কুক চীনের ওপর ১৪৫ শতাংশ শুল্ক থেকে তার কোম্পানির জন্য ছাড় আদায় করে নিতে সক্ষম হন। প্রতিবেদন অনুসারে, যারা প্রেসিডেন্টকে চুপিসারে বোঝাতে পেরেছেন, তারা ছাড় পেয়েছেন। অন্যদিকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা করপোরেটদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন। সম্প্রতি অ্যামাজনের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক ও শত্রুসুলভ আচরণের’ অভিযোগ এনেছে হোয়াইট হাউজ। শুল্কের কারণে দামের বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করতে চেয়েছিল কোম্পানিটি। এরপর অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে জানান, তার কোম্পানি কখনো এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ওয়াল স্ট্রিটও প্রকাশ্যে সমালোচনা না করে পরোক্ষ বার্তা দেয়ার কৌশল বেছে নিয়েছে। তারা প্রশাসনের সঙ্গে সংলাপের জন্য পেছনের দরজা বেছে নিচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিটের এক শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘টেলিভিশনে সমালোচনা করে আপনি খুব একটা ফল পাবেন না। বরং গোপনে বাস্তবমুখী আলোচনা করলেই বেশি কার্যকর হবে।’
যদিও বিল অ্যাকম্যান, কেন গ্রিফিন ও রে ডালিওর মতো বড় বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্পের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের সতর্কতার বাস্তব ভিত্তি ট্রাম্পকে পিছু হটতেও বাধ্য করেছে।